একই দিনে পরপর দু’টো ভূমিকম্প মোটামুটি হালকার ওপর দুলিয়ে দিয়ে গেল। ধাক্কাটা অবশ্য লাগল তার পরদিন, যখন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে গেল মাস ছয়েক পুরোন একটি খবর— বাংলাদেশের গা বেয়ে, কিংবা হয়ত তার ঠিক শরীরের নীচ দিয়েই, একটি ফল্টলাইন গেছে বলে বিজ্ঞানীরা অনুমান করছেন। এই লাইনটিতে গত কয়েকশ বছর ধরে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, যার ফলে যেকোন সময় রিক্টার স্কেলে ৮ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হয়ে যেতে পারে।
(আরও দেখুনঃ CNN রিপোর্ট)

বাংলাদেশে বড় আকারের ভূমিকম্প হলে তা অন্যান্য দেশের তুলনায় ভয়াবহ কেন হবে? কারণ বাংলাদেশে জনসংখ্যার ঘনত্ব অত্যন্ত বেশী। কিন্তু ভয়াবহ বলতে ঠিক কতটা ভয়াবহ? কোন আনুমানিক চিত্র চোখের সামনে না থাকলে কি করে বুঝব কতটা ভয় পাওয়া উচিত? ঘূর্ণিঝড় না হয় দেখেছি, ‘৭০-এ, ’৯১-এ। ভূমিকম্পের ভয়াবহতা তো দেখিনি!

কথা ঠিক। বড় আকারের ভূমিকম্প সেই ১৮৯৭ এর পর আর হয়নি। আর সে সময় তো আমার ঠাকুরদারও জন্ম হয়নি! সমস্যা হল, সেজন্যেই ভয়টা আরও বেশী— ১৮৯৭ থেকে বেশ খানিকটা সময় পেরিয়ে গেছে। প্রাকৃতিক নিয়মে আরেকটি ভূমিকম্প ভেতরে ভেতরে তৈরী হচ্ছে, অথচ আমরা টেরও পাচ্ছি না। তাহলে কি করা উচিত? ভয় পাওয়া উচিত? কিন্তু যা দেখিই নি, তাকে ভয় পেতে গেলে তো ভয়টা প্যানিক হয়ে যাবে! তাতে যদি ক্ষতির সম্ভাবনা আরও বেড়ে যায়?

অত্যন্ত যুক্তির কথা। না জেনে ভয় পেতে থাকলে ফল উল্টো হতে পারে। তাই আমাদের জানতে হবে। বুঝতে হবে। সচেতন হতে হবে। ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেয়ার মত সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তি এখনও আবিষ্কার হয়নি, কিন্তু ভূমিকম্প এলে কোথায় কি ধরণের ক্ষতি হতে পারে, তা প্রায় সঠিকভাবে মেপে ফেলার পদ্ধতি বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন। এবং আরও মজার ব্যাপার হল, বাংলাদেশের তিনটি প্রধান শহরের আনুমানিক ক্ষয়ক্ষতির ওপর একটি পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট বেশ কয়েক বছর আগেই তৈরী হয়েছে, যা আমরা অনেকেই জানি না। Comprehensive Disaster Management Program (CDMP) এর আওতায় বেশ বড় আকারে গবেষণা ও অনুসন্ধান চালানো হয় ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট শহরের ওপর, যার ফলাফল প্রকাশ হয় ২০০৯ সালের জুলাইতে। যারা একটি আনুমানিক চিত্র পেতে চান, তারা রিপোর্টটি  পড়ে দেখতে পারেন।

একটু উদাহরণ দিলে হয়ত রিপোর্টটি সম্পর্কে কিছু ধারণা পাওয়া যাবে। ধরুন, রিক্টার স্কেলে ৬ মাত্রার ভূমিকম্প হল ঢাকার ঠিক নীচে। তাতে ভেঙ্গে পরতে পারে এমন ভবনের সংখ্যা শুধু ঢাকা শহরেই ২৭ হাজারের বেশী। এর মধ্যে প্রায় ২৪ হাজার ভবনের হয়ত মেরামতই সম্ভব নয়; অর্থাৎ পুনর্নির্মান ছাড়া উপায় নেই। ৬টি মহাসড়ক ও সেতুর পর্যাপ্ত ক্ষতি হতে পারে। ১৫৩টি পানি সরবরাহ কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং পাইপলাইনগুলোর ৩৫১টি জায়গা ভেঙ্গে পরতে পারে। গ্যাসের পাইপলাইনও ২৪৭টি জায়গায় ভেঙ্গে পরতে পারে। ৭২ মিলিয়ন টন ধ্বংসাবশেষ তৈরী হতে পারে। ভয়াবহ আগুন লেগে যেতে পারে ১০৭টি জায়গায়। মৃতের সংখ্যার আনুমানিক হিসাব হয়েছে দুই ভাবে। ভূমিকম্প যদি দুপুর ২টোয় হয়, ১ লক্ষ ৮৩ হাজার ৪৫০ জন প্রাণ হারাতে পারে। যদি রাত ২টোয় হয়, এ সংখ্যা ২ লক্ষ ৬০ হাজার ছাড়িয়ে যাবে। শুধু ঢাকা শহরেই।

এ হিসাবগুলো করা হয়েছে HAZUS নামের একটি আমেরিকান টুলের মাধ্যমে। এগুলো কতটা নির্ভরযোগ্য তা কেউই বলতে পারে না। তবে কোনরকম হিসাব ছাড়া বসে দুশ্চিন্তা করার চেয়ে মোটামুটি একটা তালিকা সামনে থাকলে নীতি নির্ধারণ করতে সুবিধা হয়। আমাদের দেশে দালানকোঠা তৈরীর পুরো ব্যাপারটাই নানা অনিয়মে জর্জরিত (আমার আগের লেখাটি পড়ে দেখতে পারেন)। আইন প্রণয়ন ব্যবস্থারও রাতারাতি পরিবর্তন সম্ভব নয়। এ অবস্থায় একমাত্র উপায় হচ্ছে যার যার নিজের বাসস্থানটি অন্তত যেন নিয়ম মেনে তৈরী হয়, তা নিশ্চিত করা। আমরা নিজেরা প্রত্যেকে সচেতন হলে এ ঝুঁকি অনেকাংশেই কমানো সম্ভব।

(ভূমিকম্পের সময় তাৎক্ষণিকভাবে নিজেকে কিভাবে বাঁচানো যায়, তার কিছু দিক নির্দেশনা আছে বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিসের এই পেইজটিতে। একেবারে নিখুঁত হয়ত নয়, তবে মোটামুটি ধারণা নেয়ার জন্যে যথেষ্ট।)

Advertisements