দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বা Disaster Management কথাটি আমরা সবাই কোথাও না কোথাও শুনেছি। অর্থও মোটামুটি ধারণা করে নিতে পারি। প্রত্যেক দেশেই বিভিন্ন ধরণের দুর্যোগ বা জরুরী অবস্থা সামাল দেয়ার জন্য এ ধরণের অফিস বা ব্যবস্থা আছে। এ ব্যবস্থাগুলো গড়ে ওঠে সাধারণত বারবার যে দুর্যোগগুলো আসে, সেগুলোকে ঘিরে। যেমন, জাপানের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা তৈরী হয়েছে ভূমিকম্প, সুনামি, সাইক্লোন, ভূমিধ্বস—এসব সামাল দেয়ার মত করে। পাড়া পর্যায়ের সমিতিগুলো থেকে শুরু করে দেশের প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত ছক কেটে চার্ট করা আছে। যে যার কাজ করে যাবে আর ওপরের ব্যক্তিকে জানাতে থাকবে। যাদের সময় আছে তারা এই রিপোর্টটি, বিশেষ করে ৭ নম্বর পৃষ্ঠার চার্টটি পড়ে দেখতে পারেন।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আমাদের দেশেও আছে। এর মাধ্যমে আমরা বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মত প্রাকৃতিক দুর্যোগের মোকাবেলা করছি প্রায় প্রতি বছর। ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এতটাই কমিয়ে ফেলতে পেরেছি, যে অন্যান্য দেশ থেকে গবেষকরা এসে উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে থেকে ব্যাপারটা ভালভাবে বোঝার চেষ্টা করছে। আমাদের দেশের ভৌগলিক অবস্থানের কারণে ঘূর্ণিঝড় এত বেশী হয়, যে একে নিয়ে স্টাডি করার অনেক সুযোগ আমাদের হয়েছে। কিন্তু একটা ছোট্ট প্রশ্ন আছে— ভূমিকম্প এলে এই একই মডেলের ব্যবস্থাপনায় কি কাজ হবে?

উত্তর হ্যাঁ এবং না দু’টোই, তবে না-এর ভাগটা বেশী। এর প্রধান কারণ হল, ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার ক্ষেত্রে পূর্বাভাস পাওয়া যায়, কিন্তু ভূমিকম্প আসে হঠাৎ করে। ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতির ধরনটা একেবারেই আলাদা। অন্যান্য দুর্যোগকে কেন্দ্র করে যে সিস্টেম গড়ে উঠেছে, তা দিয়ে ভূমিকম্পকে মোকাবেলা করা যাবে না। তবে আশার কথা হল, বেশ কয়েক বছর ধরে ভেতরে ভেতরে ভূমিকম্পের ব্যাপারগুলোকেও যুক্ত করা হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা যখন থেকে আমাদের এলাকার আশপাশে বড় ধরণের ভূমিকম্পের সম্ভাবনার কথা বলে আসছেন, প্রায় তখন থেকেই বিভিন্ন পর্যায়ে নানা ধরণের কাজ হয়েছে এবং হচ্ছে। কিছুদিন আগে এই রিপোর্টটি পড়লাম। জরুরী অবস্থায় কোন সংগঠন কোন পর্যায়ে কাজ করবে তার একটি ছক কাটা আছে ৩৭ পৃষ্ঠায়। তবে ছকের অক্ষরগুলো অত স্পষ্ট নয় বলে আমি নিজের কালেকশানের জন্য ছকটি আবার তৈরী করেছি। নীচে দেখুন।

drm-system-001

বুঝলাম পরিকল্পনা একটা আছে। কিন্তু তারপরও কথা থাকে। ধরুন হঠাৎ ভূমিকম্পে সব ওলোট-পালোট হয়ে গেল। ছকটি যদি খুঁজেই পাওয়া না যায় কি করে বুঝব কার দায়িত্ব কি ছিল? আমি জেনে অবাক হয়েছি, এমন পরিস্থিতি নাকি জাপানে প্রায়ই হয়—এত প্রস্তুত থাকার পরও হয়। ২০১৬ সালের ১৪ই এপ্রিল কুমামোতোতে ভয়াবহ ভূমিকম্প হল। জরুরী ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে যারা ছিল যেভাবে পারল নির্ধারিত জায়গায় জড়ো হল। কিন্তু তারপর? প্রথম দিকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা সদস্যদের অনেকে বুঝতেই পারছিল না তাদের কি করা উচিৎ। অথচ এ ধরণের পরিস্থিতির জন্য তাদের যথেষ্ট তৈরী থাকার কথা ছিল।

fullsizerender-3

তারপরও দেখা যায় জরুরী পরিস্থিতি আমরা একভাবে সামাল দিয়ে ফেলি। কেন? কারণ এসব পরিস্থিতিতে আমাদের মস্তিষ্ক একটা ‘ইমার্জেন্সী মোডে’ চলে যায়, আর শেষ পর্যন্ত তার হাতেই আমরা সব ছেড়ে দেই। আমরা যত প্রস্তুতই থাকি না কেন, দুর্যোগ দুর্যোগই। আমরা যত চার্ট বা হ্যান্ডবুক বা ‘ম্যানুয়াল’ই তৈরী করি না কেন, ফাঁক থেকেই যাবে। সেই সব পরিস্থিতিতে তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্তগুলো আসবে কোথা থেকে জানেন? আমাদের সহজাত প্রবৃত্তি থেকে। যে কারণে জাপানে ভূমিকম্পের ট্রেনিং শুরু হয় একেবারে কিন্ডারগার্টেন থেকে—যাতে যে কোন অবস্থায় তারা খুব অল্প সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তটি নিতে পারে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার একটা শক্ত অবকাঠামো থাকা খুব দরকার, নিঃসন্দেহে; কিন্তু বিপদ এলে প্রথম দিকটা নিজেদেরকেই সামাল দিতে হয়। তাই সচেতনতার বিকল্প নেই। প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা যতই থাকুক না কেন, Disaster Management-এর শুরু আসলে আমরা যে যেখানে আছি, সেখান থেকেই।

Advertisements