আজ খবরের কাগজ খুলেই চোখে পরল সেই ভয়ংকর ছবিগুলো। চার বছর আগে এই দিনে সম্পূর্ণভাবে ধ্বসে পরেছে  রানা প্লাজা, আর সেই সাথে আমাদের সবার চোখের সামনে মেলে ধরেছে অপ্রিয় কিছু সত্য। হারিয়েছে শত শত নিরপরাধ জীবন। বাকীরা শারীরিক-মানসিক ক্ষত নিয়ে কোনরকমে বেঁচে গেছে। এক মুহূর্তে সারা বিশ্বের মিডিয়ার কেন্দ্রে চলে এসেছে এই খবর। কারণ, বাংলাদেশকে না চিনলেও বাংলাদেশে তৈরী পোশাক আমদানি করছে এমন দেশের সংখ্যা অনেক। আর রানা প্লাজার অধিকাংশই ভাড়া নিয়েছিল এই পোশাক তৈরীর কারখানাগুলো।

পোশাক শিল্প আমাদের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, আর এর শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অন্য সব বিষয়ের চাইতে বেশী গুরুত্ব পাওয়া উচিৎ।  দেশী-বিদেশী মানবাধিকার সংস্থাগুলোও এ ঘটনার পর অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে। কিন্তু তার পাশাপাশি আরও একটি ব্যাপার ছিল যার যথেষ্ট গুরুত্ব পাওয়া উচিৎ ছিল। অন্তত আমাদের দেশের ভেতরে। তা হল অবৈধভাবে ভবন নির্মান করার পরিণতি সম্পর্কে সর্বসাধারণকে সচেতন করে তোলা। এই অত্যন্ত মর্মান্তিক ঘটনাটির মূলে রয়েছে সেটিই। আমাদের দেশে গার্মেন্টস কারখানার ভবনগুলোই যে শুধু ঝুঁকিতে আছে, তা কিন্তু নয়। এ ধরণের বা এর চাইতেও দুর্বল ভবন আরও অনেক আছে। আর এরকম একটি ঘটনার পর সেই ভবনগুলো চিহ্নিত করা বা সারিয়ে নেয়া, কিংবা অন্তত সেরকম একটি উদ্যোগ নেয়া অত্যন্ত জরুরী ছিল।

প্রথমে আসুন, রানা প্লাজায় আসলে কি ঘটেছিল তা আরেকবার দেখে নেই। এই তথ্যগুলো দেশী-বিদেশী মিডিয়াতে এত প্রচার হয়েছে যে নতুন করে কিছু বলার নেই। শুধু লেখার সুবিধার্থে আরেকবার চোখ বুলিয়ে নেয়া। রানা প্লাজার নকশা তৈরী হয় ২০০৫ সালে, কাজ শুরু হয় পরের বছর, ২০০৬ সালে। অনুমোদন কর্তৃপক্ষ সাভার পৌরসভা। স্থপতি নিয়োগ করা হয়েছিল, ইঞ্জিনিয়ারও ছিল (তাদের নাম না হয় এখানে না লিখলাম)। মজার ব্যাপার হল, ২য় তলা নির্মানের পর মালিক নিজেই সব কাজের দায়িত্ব নেয়, যার ভবন নির্মান সম্পর্কে কোন জ্ঞান বা প্রশিক্ষণ নেই। পরে জানা গেছে, রানা প্লাজার অনুমোদন হয়েছিল দুই ধাপে। প্রথমে ২০০৬ সালে মাটির নীচে ১ তলা ও ওপরে ৬ তলার অনুমোদন হয় ও কাজ শুরু হয়। তার দু’ বছর পর ২০০৮ সালে মাটির ওপরের তলার সংখ্যা বাড়িয়ে ১০ তলা করে আবার নকশা পেশ করা হয়। দ্বিতীয়বার নকশার সাথে স্ট্রাকচারাল ড্রয়িংও জমা দেয়া হয়, কিন্তু তা অননুমোদিত অবস্থায় পৌরসভা দপ্তরে রয়ে যায়। তা সত্ত্বেও নির্মান কাজ চলতে থাকে এবং ২০১০ সালে অসম্পূর্ণ অবস্থাতেই ভবনটির ব্যবহার শুরু হয়। বেইসমেন্টে পার্কিং ও গার্মেন্টসের অফিস, ১ তলা ও ২ তলায় দোকান। ৩ থেকে ৮ তলাতে দোকান ও অফিসের অনুমোদন ছিল, কিন্তু সেখানে আসলে কি ছিল তা আমরা সবাই জানি। ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার হয় এরকম যেকোন কারখানার নির্মান প্রক্রিয়া সাধারণ ভবনের চেয়ে অনেক আলাদা। রানা প্লাজা যে শুধু তলার সংখ্যার ক্ষেত্রে মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছিল, তাই নয়। প্রাথমিক অনুমোদনের ৬ তলার জন্যেও যে ন্যুনতম ফাউন্ডেশন দরকার ছিল, তাতেও ফাঁকি দিয়েছিল। অর্থাৎ, শুধুমাত্র ৬ তলার শপিং মল হিসেবেও ভবনটি দুর্বল ছিল। সেখানে যোগ হয়েছিল অতিরিক্ত ৩ তলা, এবং অধিকাংশ তলাতেই ছিল ভারী যন্ত্রপাতিসহ শ’ শ’ শ্রমিক। ফলে ব্যবহারের ৩ বছরের মধ্যে, ২০১৩ সালের এই দিনে সম্পূর্ণ ধ্বসে পরে ভবনটি। পদে পদে অবহেলা ও আইন অগ্রাহ্য করার মূল্য দিতে হল কয়েক হাজার জীবনকে।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে ভবন নির্মানের ক্ষেত্রে এ ধরণের অনিয়ম আমাদের দেশে কোন বিরল ঘটনা নয়। যার ফলে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। মাঝারি থেকে বড় আকারের একটি ভূমিকম্পে এদের সবার পরিণতি হতে পারে রানা প্লাজার মত। শুধুমাত্র একটি ভূমিকম্প এসে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে উন্মুক্ত করে দিতে পারে আমাদের সবচেয়ে অবহেলার জায়গাগুলোকে— তা সে ভবন নির্মান বা আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেই হোক, আর দুর্যোগ মোকাবেলার ক্ষেত্রেই হোক। কর্তৃপক্ষের নজর এড়িয়ে যে ২ তলা অতিরিক্ত বানিয়েছিলাম… পর্যাপ্ত লোহা বা সিমেন্ট না কিনে যে পয়সা বাঁচিয়েছিলাম… বাড়ির ভেতরে জায়গা বেশী রাখতে যে রাস্তার জন্য জায়গা ছাড়িনি… আবাসিকের অনুমোদন নিয়ে যেখানে দোকান ভাড়া দিয়েছিলাম… দোকানের অনুমোদন নিয়ে যেখানে কারখানা খুলেছিলাম… এই নিয়মের অবহেলা, এই অবৈধতাই শেষ পর্যন্ত সব কেড়ে নিতে পারে। ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে যেটা বেশী ভয়ের, তা হল এর ব্যাপকতা। রানা প্লাজার ক্ষেত্রে উদ্ধারকাজ চালিয়ে কিছু জীবন অন্তত বাঁচানো গিয়েছিল। কিন্তু ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে দুর্বল ভবনগুলো ভেঙ্গে পরতে পারে প্রায় এক সাথে, সারা শহর জুড়ে। এ অবস্থায় উদ্ধারকাজ চালানো হয়ত সম্ভবই হবে না।

রানা প্লাজা নিয়ে লিখতে গিয়ে আবার সেই ভূমিকম্পের কথাই চলে এলো। এমন হওয়াটা অবশ্য স্বাভাবিক। বিল্ডিং সেইফটির কথা উঠলে ভূমিকম্পের ব্যাপারটি এসে যায়। আর এসে গেলই যখন, খুব সহজ, সাধারণ একটি কথা দিয়ে শেষ করি।

যে ভূমিকম্প নিয়ে আমাদের এত দুশ্চিন্তা, এত ভয়, সে ভূমিকম্প কিন্তু নিজে মানুষ মারে না—মারে এই দুর্বল ভবনগুলো।  আসুন সচেতন হই, নির্মান বিধিমালা মেনে চলি।

(ওপরের ছবিটি নেয়া হয়েছে ডেইলী স্টার পত্রিকা থেকে।)

Advertisements